Sunday, 1 March 2015

মুসলিম সমাজে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত(২/৭)

৩য় পর্ব

পরিবারের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার প্রধান উপায় হলো স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক বা দৃঢ় বন্ধন গড়ে তোলা। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই বন্ধন ঠিক গড়ে উঠছে না। এর কিছু কারণ আমরা গত কয়েকটি পর্বে তুলে ধরেছি। এবারের পর্বে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচন করব। "ছেলেটা শেষ পর্যন্ত গোল্লায় গেল। পড়ালেখা কিছুই হচ্ছে না। খালি খেলাখুলা খা----লি খেলাধুলা। হবে কোত্থেকে! যা একখানা স্কুল, তার আবার মাষ্টার। ছাগলকে ঘাষ খাওয়ায় আর ছেলেদের নামতা শেখায়। ছাগলগুলোও যা, যখনি দেখি খালি পেট, যেন এই দেশে ঘাস-টাস নেই। ঘাস থাকবেই বা কোত্থেকে। এখনকি আর অত খালি জায়গা আছে যে ঘাস জন্মাবে। যেখানে-সেখানে বাড়ি-ঘর উঠছে আর উঠছে। না উঠেই বা কি হবে! যেভাবে জন্ম নিচ্ছে পোলাপান! আজব এক দেশ! জায়গার চেয়ে মানুষ বেশী, এতবেশী সুনামী হইলো কিন্তু কোন কমতি নেই।" এভাবে অভিযোগের নামতা পড়তে পড়তে লোকটি বাসায় এসে বৌকে বলতে শুরু করলো, "তোমার পোলাপানের কী খবর! খবর টবর কিছু রাখো! রাখবে কোত্থেকে, তোমার কি আর সংসারের চিন্তা আছে! যেন সংসারটাতো আমার একার! তোমারতো খালি বাপের বাড়ীর চিন্তা....."

পৃথিবীতে এমন মানুষ সত্যিই বিরল যে তার নিজের অবস্থা নিয়ে পরিপূর্ণ সুখী। তারপরও কেউ কেউ নিজের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে সুখেই আছে, কারণ এর কষ্টের কথা মনের গভীরে গোপন করে রাখার চেষ্টা করে। পক্ষান্তরে কিছু কিছু লোক আছে, যারা এতো দুর্বলচিত্ত যে দুঃখ-কষ্ট বা সমস্যার কথা গোপন রাখতে পারে না। কাউকে পেলেই অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করে দেয়। এ ধরণের লোকেরা পৃথিবীর সকল ব্যাপারেই অভিযোগ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের অভিযোগ থেকে কেউই আর বাদ পড়ে না। বন্ধু-বান্ধব কাউকে পেলেই শুরু হয়ে যায় অভিযোগ চর্চা। এ পর্বের শুরুতেই আপনারা যে ঘটনাটি জেনেছেন, তা-ই এর প্রমাণ। এরা ধীরে ধীরে বন্ধু-বান্ধবহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু পরিবার-পরিজন ও সন্তানরা এই অভিযোগকারীর কথা চোখ-কান বুঁজে শুনে যেতে বাধ্য হয়। তাদের আর কিছুই করার উপায় থাকে না। ভেতরে ভেতরে তাই অসহ্য ও বিরক্ত হয়ে পড়ে। বিপজ্জনক বিষয়টি হলো পরিবারের খুঁটিনাটি ব্যাপারেও এরা অভিযোগপ্রবণ হয়ে ওঠে।

পরিবারের সবাই তাই অভিযোগ আতঙ্কে ভুগতে থাকে। অভিযোগের ব্যাপারটি একচেটিয়া যদি হয়, তাহলে হয়তো সমস্যা হয় না। কিন্তু যখনি অপর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ আসে তখনি দেখা দেয় বিপর্যয়। এই বিপর্যয় পরিবারেরও বিপর্যয় ডেকে আনে। অথচ ইসলাম অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকাকে উত্তম আচরণ বলে মনে করে। কেউ কোন বিপদে পড়লে অন্যের কাছে অভিযোগ না করে আল্লাহর দরবারেই সকল সমস্যা সমাধানের জন্যে প্রার্থনা করা উচিত। কারণ আল্লাহই সকল কিছু সমাধানের মালিক। মনে রাখবেন, আপনার স্ত্রী বাইরের বিভিন্ন ঝামেলা বা অভিযোগের কথা শুনতে চায় না আপনার কাছ থেকে, সে অন্য কিছু আশা করে। আপনি তার ইচ্ছা-আকাঙ্খাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এইসব বাজে প্রবণতা ত্যাগ করার চেষ্টা করুন । বাড়ি ফিরে বাইরের দুনিয়ার সব সমস্যার কথা ভুলে যান। পরিবারের সাথে সুখে-শান্তিতে সময়টা পার করার চেষ্টা করুন । হাসি-আনন্দে ভরে তুলুন সময়টাকে। পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ করার চেষ্টা করুন। একসাথে খেতে বসুন, হাস্যালাপ করুন। আপনার স্ত্রীর রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ছেলেমেয়েদের সময় দিন। তবেই গড়ে উঠবে সোনালী নীড়। কিছু কিছু মানুষ আছে খিটখিটে মেজাজের। তারা খালি দোষ খুঁজে বেড়ায়। আর কিছু একটা পেলেই ঝগড়া বাঁধিয়ে দেয়। কথায় কথায় ঝগড়া করাটাই তাদের কু-অভ্যাস। তারা তুচ্ছ কোন ব্যাপার নিয়েও এতো বাড়াবাড়ি করে যে, সংসারে সবসময় ঝগড়া বেঁধেই থাকেই।

কোন স্ত্রীই এ ধরনের খুঁতখুঁতে স্বভাবের স্বামীকে পছন্দ করে না। তাই বহু পরিবার ভেঙ্গে যায়। যেমন ধরুন বাসাবাড়ি সাধারণত স্ত্রীরাই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু অনেক সময় কাজের চাপে একটু আধটু দেরী হতেই পারে। অথচ দায়িত্বটা স্ত্রীর একার নয়। স্বামীরও বটে। কিন্তু স্বামী যদি সেই চিন্তা না করে গজ্ গজ্ করে বলতে থাকেন-টেবিলটা দেখি নোংরা হয়ে আছে, কেন? এ ঘরে কি কেউ নাই? আহ্ ! কতবার বলেছি এ্যাশট্রেটা কখনো ফ্লোরে রাখবে না, কে শোনে কার কথা?-(সজোরে )কী হলো, রান্নাবান্না হয়নি নাকি; ইত্যাদি। একথা সত্য যে, সংসারে কাজকর্ম করতে গিয়ে ছোট-খাটো ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতেই পারে। সেই ভুল যে কেবল স্ত্রীরই হয়, তা নয় বরং স্বামীও ভুল করতে পারেন। এখন ভুল হলে সেজন্যে পরস্পরকে তিরস্কৃত না করে বরং আলাপ-আলোচনা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করতে হবে। আলোচনার সৌহার্দ্যপূর্ণ পথ পরিহার করে স্ত্রীকে একচেটিয়া দোষারোপ করতে থাকলে স্ত্রী অবশ্যই স্বামীর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়বে। যার পরিণাম না তাদের কারো জন্যে পুরো মঙ্গলজনক হবে, না তাদের সন্তান-সন্ততির জন্যে। পুরো পরিবার সংগঠনটিই বরং ভেঙ্গে যাবে। এ ধরণের পরিস্থিতি এড়াতে রাসূলের দিক নির্দেশনার প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই একমাত্র উপায়। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "তোমরা যারা শুনে শুনেই ঈমান এনেছো, কিন্তু আন্তরিক বিশ্বাসে যাদের হৃদয় এখনো পূর্ণ হয়নি, তাদেরকে বলি কোন মুসলমান সম্পর্কে নিন্দা করো না। কারণ যে বা যারা অপরের দোষত্রুটি বা খুঁত ধরে বেড়ায়, আল্লাহ তাদেরকে সমালোচনা করেন। আর এই রকম কোন ব্যক্তি সে যদি নিজের বাড়ীতেও থেকে থাকে, তবুও অসম্মানীত হবে।"

একটা ব্যাপার স্বামীদের অন্তরে সাধারণত কমই জাগে, আর তা হলো পুরুষের মতো নারীর মনও পরিবর্তিত আবেগের শিকার। যেমন সুখানুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়, তেমনি ক্রোধ এবং দুঃখেও ভারাক্রান্ত হয়। একঘেঁয়ে ঘরকন্যার কাজ, সন্তানদের কোন আচরণ কিংবা অন্যের কোন কথায়ও আপনার স্ত্রী রেগে থাকতে পারেন। এরকম বিপর্যস্ত মন নিয়ে তুচ্ছ কোন বিষয়েও অন্যদের সাথে তিনি রূঢ় আচরণ করে ফেলতে পারেন। এমন অবস্থায় তার রাগ ভাঙ্গানো স্বামীরই দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে! না, আপনি মোটেই স্ত্রীর রাগ ভাঙ্গাতে গিয়ে প্রভাব খাটিয়ে তার রাগের আগুনকে দ্বিগুন করে তুলবেন না। বাসায় ফিরে স্ত্রীকে রাগান্বিত দেখলে আপনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুন, হাসি-খুশি থাকুন, কঠোরতা পরিহার করে হাসিমুখে কথা বলুন। টুকিটাকি কাজে তাকে সহযোগিতা করুন। কোনভাবেই আপনি জানতে চাইবেন না যে, ˜কী ব্যাপার বলো তো!' বরং আপনার স্ত্রী যদি নিজ থেকে কথা বলতে চায়, গভীর মনোযোগের সাথে তার কথা শোনার চেষ্টা করুন এবং তার সমস্যা সমাধানে আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল হবার চেষ্টা করুন। ক্ষোভের কারণ দূর করার কাজে সহযোগিতা করুন, তাকে সান্ত্বনা দিন। আপনার সাহায্যই তার কাছে সবচেয়ে বেশী মূল্যবান বলে প্রতীয়মান হবে। এর ব্যতিক্রম কোন আচরণ করলে আপনাদের মধ্যকার মানসিক সংঘাত তীব্রতর হবে। নবী-রাসূলদের কথা বাদ দিয়ে বলা যায়, দুনিয়ার কোন মানুষই ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। কিংবা কেউই সম্পূর্ণ নিখুঁত বা সর্বগুণ সম্পন্ন নয়।

তারপরও বিয়ের আগে প্রতিটি স্বামী মনে মনে কল্পনা করে যে, তার স্ত্রীটি হবে সর্বগুণে গুণান্বিতা একটি আদর্শ নারী। কিন্তু বাস্তবেতো তা সম্ভব নয়। সেজন্যে বিয়ের পর কল্পনার স্ত্রীর সাথে বাস্তবের স্ত্রীকে মিলিয়ে দেখলে বহু অপূর্ণতা চোখে পড়ে। স্বামীটি তখন ভাবতে থাকে, কী চেয়েছিলাম, আর কী পেলাম! এধরণের হতাশা ব্যক্ত করে পরিপূর্ণতার খোঁজে বাইরের দিকে দৃষ্টি দেয় । স্ত্রী তাকে ফেরাতে চাইলে স্ত্রীকে মারধর করে, অপমান করে, গালাগালি করে। নিশ্চয়ই আজম রেজা'র ফাঁসীর খবরটি পড়তে ভোলেন নি। আজম রেজা ছিলেন একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। বিয়ে করেছেন, জয়ন্তী নামের এক সুন্দরী শিক্ষিকাকে। কিছুদিন চমৎকার দাম্পত্য জীবন কাটানোর পর আজম রেজা আরেক সুন্দরী অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। কোন স্ত্রীরপক্ষেই এ ধরনের সম্পর্ক মেনে নেয়া সম্ভব নয়। জয়ন্তীও মেনে নেয়নি। ফলে আজম রেজা নির্মমভাবে স্ত্রীকে হত্যা করে। আদালত খুনের দায়ে আজম রেজাকেও ফাঁসীর আদেশ দেয়। এই যে দীর্ঘদিন পর স্বামীর পরকীয়া প্রেমে পড়া, তা নিশ্চয়ই হঠাৎ করে হয়ে ওঠেনি। একটু একটু করে দিনের পর দিন এরকম সম্পর্ক গড়ে ওঠে সাধারণত। কিন্তু কেন? নিশ্চয়ই স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীর প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিযোগ ঘটেনি, কিংবা এমন কোন ব্যাপার, যা স্বামী তার স্ত্রীকে ভালোবেসে বুঝিয়ে নিতে পারতো। আর যদি স্বামীই অবৈধ কামনা চরিতার্থতার জন্যেই অসৎ সঙ্গে পড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী নিশ্চয়ই তা আগেই টের পেয়েছে। সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বামীকে বহির্মুখিতা থেকে ফেরানো স্ত্রীর পক্ষে অসম্ভব ছিল না। তারপরও একান্তই যদি তা সম্ভব না-ই হতো, তাহলে সর্বশেষ পথ পারিবারিক আদালতে যাওয়া যেত। এসব ক্ষেত্রে নবীজীর শিক্ষা ছিল পরস্পরকে ক্ষমা করার ব্যাপারে উদার হওয়া।

আজম রেজা আর জয়ন্তীর ক্ষেত্রে যেহেতু তা হয়নি, সেহেতু দুঃখজনক পরিণতি দুজনকে ভোগ করতে হলো। আর পরিবারটি ভেঙ্গে হয়ে গেল খান খান। অন্যের ভুল-ভ্রান্তিকে উপেক্ষা করা ও ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা মানুষের একটা বিশেষ গুন যা জন্তুদের নেই। কেউ যদি অন্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়াই হলো মহত্বের লক্ষণ। ক্ষমার আনন্দানুভূতি উপভোগ করার মধ্যে যে আত্মিক প্রশান্তি থাকে, তা এক কথায় অলৌকিক। কিন্তু তারপরও মানুষ হিংসুক হয়, পরশ্রীকাতর হয়, প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়। এই পাশবিক গুনটি যেন আমাদের ভেতরে বাসা না বাঁধে, সে ব্যাপারে আন্তরিক হওয়া উচিত। হিংসা এবং পরশ্রীকাতরতা থেকে মানুষ নিন্দুক হয়ে ওঠে। গীবত চর্চা করে তারা অন্যের ক্ষতি করতে উদ্যত হয়। কোন পরিবারে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মধুর সম্পর্ক থাকে, নিন্দুকেরা তাদের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে তৎপর হয়ে ওঠে। এসব ক্ষেত্রে নিন্দুকেরা এমনসব গুজব ছড়ায়, যা থেকে রেহাই পেতে হলে প্রয়োজন ঠাণ্ডা মাথায় সংবেদনশীল মন নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মাঝে বিষয়টি আলোচনা করা। জিজ্ঞাসাবাদ নয় বরং সত্য আবিস্কারের ব্যাপারে উভয়কে আন্তরিক হওয়া উচিত। কোন রকম রূঢ় মনোভঙ্গী এ ক্ষেত্রে বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমি আমার স্বামী, শ্বাশুড়ী ও ননদসহ একত্রে থাকি। প্রথম প্রথম স্বামীর সাথে ভালোই কেটেছে আমার। একটা মধুর দাম্পত্য জীবন আমরা কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের এই সুখ কারো কারো অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্যে আমার স্বামীর কাছে আমাকে অপ্রিয় করে তোলার জন্য আমার সম্পর্কে নানারকম গুজব স্বামীর কানে দেয়া হয়। সেসব গুজব এমন লোকদের কাছ থেকে শোনানো হয় যে স্বামীর পক্ষে তা অবিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্নকারী জানতে চাইলো-কী ধরণের গুজব একটু বলবেন ? ভদ্র মহিলা বললেন, আমার শ্বাশুড়ী চব্বিশটা ঘন্টাই আমার খুঁত ধরতে ওঁৎ পেতে থাকে। নানা ছলছুতায় আমার সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চায়। স্বভাবে এমনিতেই তিনি ভীষণ বদমেজাজী। আমার সাথে ঝগড়া করতে না পারলে আমার ব্যাপারে উল্টো-পাল্টা কথা বলে স্বামীর সাথে আমার ঝগড়া বাঁধিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সেদিন আমি কেনাকাটা করে বাসায় ফিরছিলাম। রাস্তায় ভীষণ জ্যাম ছিল। বাসায় ফেরার পর শ্বাশুড়ী আমাকে জেরা শুরু করে দিলেন। কেন দেরী হলো, কোথায় গেছো, কার সাথে পিরিতি করে বেড়াও? ইত্যাদি সব বাজে কথা।

আমাদের সমাজে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা মানবতাকে স্তব্ধ করে দেয়। ধরা যাক এরকম একটি চিত্র: দেখা গেল-একটা ঘরে হঠাৎ আগুন, সাথে চীৎকার চেঁচামেচি। পাড়া-প্রতিবেশীরা ঐ চীৎকার শুনে এগিয়ে এলো। যেই রুমের ভেতরে আগুন, সেরুমের দরজা খুলে ভেতরে দেখলো ঐ বাসার সুন্দরী বধূটির গায়ে আগুন জ্বলছে। তাড়াহুড়া করে আগুন নিভিয়ে বধূটিকে নিয়ে গেল মেডিকেলে। সৌভাগ্যবশত: বধূটি প্রাণে বেঁচে গেল। সুস্থ হবার পর গৃহবধূটিকে বাসায় যেতে বললে সে বললো, বাসায় যাবো না। প্রশ্ন করা হলো কেন যাবেন না? ভদ্র মহিলা বললো, ঐ বাসায় যাতে থাকতে না হয় সেজন্যেই তো মরতে চেয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করা হলো কেন থাকতে চান না ঐ বাসায়? জবাবে বধূটি বললো, সে অনেক কথা। প্রশ্নকারী আবার বললো, বলুন! আমরা শুনবো। তারপর ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করলেন। অবশেষে আমার স্বামী যখন বাসায় ফিরলেন, শ্বাশুড়ী কান্নাকাটি করে তার ছেলেকে সব ঘটনা বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলার পর বললো, কোন মাংস বিক্রেতার সাথে নাকি আমার বাজে সম্পর্ক আছে। একথা শুনে আমার স্বামী স্বাভাবিকভাবেই রেগে গেলেন। আমিও রাগে-দুঃখে ভেঙ্গে পড়লাম। আমি নিজেকে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করলাম। এই বলে বধূটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।

যে ঘটনাটি এতোক্ষণ আমরা শুনলাম, এধরনের ঘটনা কারোরই কাম্য নয়। এধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পারিবারিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়বে। পরিবারের ভাঙ্গন রোধ করার জন্য তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। এই ঘটনাটিতে একদিকে রয়েছে মা-বোন, অন্যদিকে স্ত্রী। উভয়ের প্রতিই স্বামী পুরুষটির দায়িত্ব রয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বামী পুরুষটিকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে অগ্রসর হতে হবে। কোন রকম বোকামীর পরিচয় দিলেই সমূহ বিপদের আশঙ্কা দেখা দেবে। যে ঘটনাটি আমরা একটু আগে জানলাম, এধরনের ঘটনা অনেক পরিবারেই অহরহ ঘটছে। এর যে কী সমাধান তা অনেকেই ভেবে কুল পান না। অথচ ইসলাম এসব ব্যাপারে চমৎকার সমাধান দিয়েছে। এবারে সে সম্পর্কেই আলোচনা করা যাক। প্রতিটি ছেলেই বিয়ের আগে বাবা মায়ের আশ্রয়ে বড় হয়ে ওঠে। ছোট বেলা থেকেই সন্তানেরা বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। বাবা-মা যেহেতু ছেলেকে লালন-পালন করে বড়ো করে তোলেন, সেহেতু তারা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেন যে, বড়ো হয়ে ছেলে তাদের দেখাশোনা করবে। কিন্তু বিয়ে করার পর বাবা-মা যখন দেখেন যে, ছেলে তার নতুন সংসার তথা স্ত্রীর প্রতিই বেশী যত্নশীল হয়ে পড়ছে, তখন বাবা-মা কষ্ট পান। ছেলেকে বিয়ে দিয়ে তারা আপাতত দৃষ্টিতে স্বাধীন করে দিলেও মনে মনে ঠিকই প্রত্যাশা করেন যে, ছেলে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে তা না দেখতে পেয়ে ভাবেন পুত্রবধূটিই এই পরিস্থিতির কারণ। সেজন্যেই তারা পুত্রবধূর ওপর থেকে ছেলের মনোযোগ কমাতে নববধূটির পেছনে লেগে পড়েন। আর বাবা-মায়ের এই দুঃখজনক আচরণ ছেলের নতুন জীবনের জন্যে মোটেই কল্যাণকর নয়। তাই ছেলেকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে যার যার অধিকার বুঝিয়ে দেয়াই হবে যুক্তিযুক্ত। বাবা-মা ছেলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে যে, ছেলে উপার্জনক্ষম হলে তাদের প্রতি ছেলে লক্ষ্য রাখবে। বাবা-মায়ের এই প্রত্যাশা তাদের অনিবার্য অধিকার।

এই অধিকার বিয়ের পরও যথাযথভাবেই অটুট থাকে। ফলে স্ত্রীর প্রতি মনোযোগী হবার পাশাপাশি বাবা-মায়ের প্রতি আন্তরিক দায়িত্ব পালনেও সক্রিয় হতে হবে। বাবা-মায়ের আর্থিক সংকট মেটানো উপার্জনক্ষম সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। তাই আগের মতোই বাবা-মায়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা ছেলের কর্তব্য। এই কর্তব্য যদি ছেলে পালন করে, তাহলে বাবা-মা ছেলের বৌ এবং সংসারের মঙ্গল কামনা করবে। সে ক্ষেত্রে ছেলের বৌ-এর পেছনে লাগার কোন কারণ আর ঘটবে না। কিন্তু তারপরও ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনা ঘটে থাকে, সেসব ঘটনার ক্ষেত্রে ছেলেকে গভীরভাবে ভাবতে হবে-বাবা-মায়ের কথা কতোটা ন্যায্য। অন্যায় বা অধর্মীয় কোন আদেশ মানতে ছেলে বাধ্য নয়-একথা বাবা-মা এবং ছেলে সবারই জানা থাকা উচিত। বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের কারণেই যদি তারা বৌকে অন্তরায় ভেবে থাকেন, সেক্ষেত্রে, ছেলের উচিত হবে-বাবা-মায়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলা। বাবা-মাকে তার ঘরে ডেকে আনা, বাচ্চাদের বলা তারা যেন দাদা-দাদীকে সম্মান করে চলে। স্ত্রীকেও বলতে হবে সে যদি শ্বশুর শ্বাশুড়ীকে সম্মান করে চলে, শ্বশুর-শ্বাশুড়ীও ছেলের বৌ-এর বিরুদ্ধে লেগে পড়ার পরিবর্তে বরং বৌকে নিয়ে গর্ববোধ করবে, পুত্র বধূকে তারা সকল ক্ষেত্রেই সহায়তা করবে। এখানে যে কথাটি উল্লেখ করা দরকার তাহলো, বাবা-মাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে স্বামী স্ত্রীমুখী হয়ে পড়ুক-স্ত্রীদের এ ধরনের চিন্তা একেবারেই অন্যায্য। এ ধরনের দাবী না ন্যায়সঙ্গত না বাস্তবসম্মত। বরং স্ত্রীরা কৌশলে বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর সাথে এমন আচরণ করতে পারে, যাতে তারা ভাবে যে বৌ তাদের সংসারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। তাতে উভয়কূল রক্ষা পাবে। মনে রাখতে হবে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা যত্নের মধ্যে সন্তানের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। বাবা-মায়ের বাইরেও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেকে ঈর্ষুক থাকতে পারে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, তাহলো বাবা-মা সাধারণত ছেলের অমঙ্গল কামনা করে না। তারা যদি ছেলের সংসারে ঝামেলা ঘটানোর কোন কারণও হয়, তা কেবল তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। ছেলে যদি তাদের অধিকার ঠিকমতো আদয় করে, তাহলে বাবা-মা ছেলের কল্যাণকামী হয়ে ওঠে। কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীরা হিংসা করে যদি কোন গীবত চর্চা করে, তাহলে তা খুবই ভয়ঙ্কর। তাদের কথায় হুট করে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই বোকামীপূর্ণ কাজ হবে। মনে রাখতে হবে বৌ আপনার জীবন সঙ্গী। সেও রক্ত-মাংশের মানুষ। পৃথিবীর কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। বৌ-এর ব্যাপারে কেউ যদি আপনার কানে কথা লাগায়, তাহলে ধীরে-সুস্থে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে ঠান্ডা মাথায় তা প্রতিহত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কোনভাবেই বাইরের লোকের কুৎসা রটনাকে পাত্তা দেয়া যাবে না।

বৌ-এর সাথে ভালোবাসাপূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে আলোচনা করার পর যদি মনে হয় যে, সত্যিই বৌ কোন অন্যায় করে ফেলেছে, তাহলে বৌ-এর ঐ অন্যায়কে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই হবে বড় মনের পরিচয়। যুক্তি দিয়ে বৌকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করুন-এর ফলে তাদের কী ক্ষতি হতে পারে, স্ত্রীকে হুট করেই কোন শাস্তি দেয়া একেবারেই ঠিক নয়। তাকে বুঝিয়ে বলার পর নিশ্চয় তার ভেতরে অনুশোচনাবোধ কাজ করবে। এর ফলে ভুলের পুনরাবৃত্তি আর নাও হতে পারে। অন্যদিকে আপনার স্ত্রী কৃতজ্ঞতায় আপনার প্রতি সব সময় সশ্রদ্ধ থাকবে। পরিণতিতে পারিবারিক শান্তি ও শৃঙ্খলা থাকবে অক্ষুন্ন। ক্রোধ খুবই মারাত্মক জিনিস। ক্রোধের আগুনে পুড়ে বহু সুন্দর সংসার ছারখার হয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে যাবার পর ক্রুদ্ধরা কিন্তু অনুতপ্ত হয়। ফলে ক্রোধ নয়, ধৈর্য্যরে পরিচয় দিন। আল্লাহ ধৈর্য্য ধারনকারীদের সাথে রয়েছেন।  

No comments:

Post a Comment